হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিম আজারবাইজানের উরুমিয়া শহরে হযরত ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এবং একদল হাওজা শিক্ষার্থীর পাগড়ি পরানোর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আহমাদ ফারখ-ফাল।
তিনি আজারবাইজান অঞ্চলকে ‘প্রাচীন, মর্যাদাবান ও সচেতন’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বে এ অঞ্চলের মানুষ খাঁটি মুহাম্মদী ইসলামের মূল্যবোধ রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বলেন, “এই বরকতময় দিনে এমন এক সচেতন ও গর্বিত জনগোষ্ঠীর মাঝে উপস্থিত হতে পেরে আমি গৌরবান্বিত।”
মাহদাভিয়াতের চিন্তা এখন বৈশ্বিক
ইরানের হাওজায়ে ইলমিয়ার সর্বোচ্চ পরিষদের সচিবালয়ের দায়িত্বশীল এই আলেম বলেন, আজ মাহদাভিয়াতের চিন্তা কেবল শিয়া বা সুন্নি মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মুসলিম বিশ্ব ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি অমুসলিম চিন্তাবিদদের মাঝেও একজন ন্যায়পরায়ণ বিশ্ব সংস্কারকের প্রত্যাশা বিদ্যমান—যিনি পৃথিবীকে ন্যায় ও ইনসাফে পরিপূর্ণ করবেন।
‘প্রতীক্ষা’—ধর্ম ও মতাদর্শের ঊর্ধ্বে একটি মূল্যবোধ
তিনি বলেন, ‘প্রতীক্ষা’ বা ‘ইন্তিজার’ একটি সাম্প্রদায়িক কিংবা কেবল ধর্মীয় ধারণা নয়; বরং এটি একটি সার্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ। ইতিহাসের নানা মতাদর্শেই এই ধারণা কোনো না কোনোভাবে উপস্থিত ছিল। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কমিউনিজমও এক সময় বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; তবে ভ্রান্ত চিন্তাধারা ও ভুল পদ্ধতির কারণে সেটি ব্যর্থ হয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।
বিশ্ব ন্যায়ভিত্তিক সংস্কারকের অপেক্ষায়
তিনি আরও বলেন, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম—উভয় ধর্মেই একজন বৈশ্বিক সংস্কারকের আগমনের বিশ্বাস রয়েছে। শিয়া ও সুন্নি উভয় ধারার বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর বংশধর সেই মাওদুদ আবির্ভূত হবেন এবং পৃথিবীকে জুলুম ও অবিচার থেকে মুক্ত করে ন্যায় ও ইনসাফে পূর্ণ করবেন।
ইসলামী বিপ্লব: দাসত্ব থেকে মুক্তির সংগ্রাম
হুজ্জাতুল ইসলাম ফারখ-ফাল বলেন, ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরান ছিল বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদের কবলে বন্দি। দেশটিকে জায়নবাদী শক্তির স্বার্থে ব্যবহার করা হতো এবং পারস্য উপসাগর অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদের ‘রক্ষী রাষ্ট্রে’ পরিণত করা হয়েছিল। কিন্তু ইমাম খোমেনী (রহ.) এসে স্পষ্ট ঘোষণা করেন—ইরান আর কখনো জুলুম ও আধিপত্যের কাছে মাথা নত করবে না।
তিনি বলেন, ইসলামকে ‘সমাজের আফিম’ হিসেবে চিত্রিত করার সাম্রাজ্যবাদী তত্ত্বকে ইমাম খোমেনী (রহ.) বাতিল করে প্রমাণ করেন—ইসলামই জাতির মর্যাদা, সচেতনতা ও স্বাধীনতার প্রধান উৎস।
বিপ্লবের ধারাবাহিকতা ও সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ভূমিকা
তিনি বলেন, শত্রুরা ধারণা করেছিল ইমামের ইন্তেকালের পর বিপ্লব থেমে যাবে। কিন্তু সর্বোচ্চ নেতার দূরদর্শী নেতৃত্বে ইরান আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় শক্তিশালী। কুরআন ও আহলে বাইতের অনুপ্রেরণায় ইরানি জাতি ইসলামের পতাকা সমুন্নত রেখেছে এবং আর কখনো আধিপত্যবাদকে এ দেশে ফিরে আসতে দেবে না।
বেলায়াতে ফকিহ—শক্তি ও স্থিতিশীলতার মূলভিত্তি
তিনি বলেন, বেলায়েতে ফকিহর প্রতি জনগণের আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতার ফলেই ইরান আজ শত্রুর বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। জনগণ যদি এই নিয়ামতের কদর না করত, তবে আল্লাহর সাহায্য থেকেও তারা বঞ্চিত হতো।
তলোয়ারের ওপর রক্তের বিজয়
সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি ছিল ১২ দিনের যুদ্ধের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র। জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী ও তাদের মিত্ররা কুরআন পোড়ানো ও মসজিদে হামলার মতো জঘন্য অপরাধ করলেও শেষ পর্যন্ত আল্লাহ ইরানি জাতিকে বিজয় দান করেছেন। এটি ‘রক্তের বিজয় তলোয়ারের ওপর’—এই ঐশী নীতির বাস্তব দৃষ্টান্ত।
ইরান যুদ্ধ চায় না, তবে জবাব হবে কঠোর
তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কখনো যুদ্ধ শুরু করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। তবে শত্রু যদি কোনো ভুল পদক্ষেপ নেয়, তাহলে এমন কঠোর জবাব দেওয়া হবে—যা ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
৪৭ বছরে এক ইঞ্চি ভূখণ্ডও হারায়নি ইরান
তিনি বলেন, ইসলামী বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন ইরান একটি ইঞ্চি ভূখণ্ডও শত্রুর হাতে তুলে দেয়নি এবং কখনোই প্রতিবেশী কোনো দেশের ভূমি দখলের পথে হাঁটেনি।
হাওজায়ে ইলমিয়া ও আলেমদের দায়িত্ব
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি হযরত আলী (আ.)–এর একটি বাণী উদ্ধৃত করে বলেন, প্রকৃত ফকিহ সেই ব্যক্তি—যিনি মানুষকে গুনাহে উৎসাহ দেন না, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করেন না, শাস্তির ব্যাপারে উদাসীন করেন না এবং মানুষকে কুরআন থেকে বিচ্যুত করেন না।
ঐক্যের আহ্বান ও শত্রুদের প্রতি সতর্কবার্তা
শেষে তিনি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে বলেন, শত্রুরা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়; কিন্তু ইরানের জনগণ, হাওজায়ে ইলমিয়া, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুদ্ধিজীবীরা কুরআনের আলোকে এসব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেবে।
আপনার কমেন্ট